আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ধূমপান, মদ্যপান ইত্যাদি বদ আসক্তির কারনে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও আছে বায়ুদূষণ, ভাইরাসের আক্রমন, খাদ্য ও বাতাসে ভাসমান বিষাক্ত টক্সিন যারা প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে আমরা না চাইলেও ঢুকে যাচ্ছে অহরহ। ফুসফুস,হার্ট ও অন্যান্য অঙ্গ এসবের কবলে পড়লে ঠিকঠাক থাকা সম্ভব নয়।
তাই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক,ফুসফুসকে কি কোনো উপায়ে আগের স্থিতিতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব? ফ্রেস স্টার্ট সকলেই চায়, কিন্তু সেইরকম কিছু কি সম্ভব? বছরের পর বছর সরাসরি ধূমপান করে ও ধূমপায়ীদের সাথে থেকে ফুসফুসকে ক্ষতিগ্রস্ত করলাম, হঠাত মনে হতে পারে সেই অঙ্গকে আবার আগের ভালো অবস্থায় নেওয়ার কথা। আর চারপাশে টিভির পর্দায়, ইউটিউবের ভিডিওতে, ফেসবুক মাধ্যমে, কখনো বা ছাপা পত্রিকার পাতায় বিজ্ঞাপনের দাবি : আমাদের কোম্পানির তৈরী চাপাতা আপনার ফুসফুসকে আগের মতো সতেজ করতে সক্ষম। চা পাতার জায়গায় কখনো দেখানো হচ্ছে খাদ্য তেল কিংবা মাল্টিভিটামিন। সবই তো প্রলোভন। অর্থনৈতিক লাভের জন্য বোকা দুর্বল মানুষদের বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলা৷
ওহিও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পালমোনোজিস্ট ড.Joshua Englert এসব বিজ্ঞাপন সম্পর্কে সচেতন করছেন। অনর্থক অর্থ খরচ করা থেকে বিরত থাকার কথা বলছেন উনি। কারন, এসবের কোনো কিছুই ফসফুসকে 'নির্বিষ' করতে পারে না।তার কথায়,"প্রচুর এরকম পণ্য বিজ্ঞাপিত হয় এবং দাবি করা হয় এই পণ্যের ব্যাবহার ফুসফুস থেকে বিষ ছাড়াতে সক্ষম। কিন্তু এখনো অবধি এই সব দাবির পক্ষে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি। "
মন খারাপ করার কিছু নেই। ভয় পাবারও কারন নেই। ফুসফুসের নিজস্ব বিশেষ একটি প্রাকৃতিক ক্ষমতা আছে যা সৃষ্টিকর্তা প্রদান করে রেখেছেন। কি সেই ক্ষমতা? ফুসফুস নিজেকে নিজে বিশেষ পরিস্থিতিতে অনেকাংশে সারিয়ে তুলতে ও ভেতরের বিষ ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম। তবু কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতা এই অঙ্গকে শক্ত ও সবল করে রাখতে পারে।
আজকে এখানে সেই সচেতনতা ও কার্যকরী বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপগুলো নিয়ে আলোচনা করব। আলসেমি না করে আপনারা ধৈর্য্য ধরে লেখাটা মনোযোগ দিয়ে পড়ে যান।
"আপনার যদি নিউমোনিয়া বা ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসের মতো তীব্র অসুস্থতা হয় তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফুসফুস পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে," স্টনি ব্রুকের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের মেডিসিনের অধ্যাপক নরম্যান এডেলম্যান বলেছেন।
কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী আঘাতের পরে, যেমন কয়েক দশক ধূমপান থেকে ঘটে যাওয়া ক্ষতির মতো, ফুসফুসগুলি কিছু ক্ষেত্রে ক্ষতি ভরাট করতে সক্ষম হয় না। ধূমপান ফুসফুসের দুই ধরণের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়: এম্ফেসিমা(Emphysema) এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস( Chronic Bronchitis)। একসাথে এগুলি ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি) হিসাবে পরিচিত। এম্ফিসেমাতে অক্সিজেনের আদান-প্রদানে সাহায্যকারী ক্ষুদ্র এয়ার থলিগুলি ধ্বংস হয়। দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিসে এয়ারওয়েজের প্রদাহ হতে দেখা যায়।একবার এয়ার থলিগুলি ধ্বংস হয়ে গেলে সেগুলিকে আর প্রতিস্থাপন করা যায় না। যদিও ব্রঙ্কাইটিসের কারনে সৃষ্ট Swelling এবং প্রদাহ দূর করা যেতে পারে, তবে কাঠামোগত ক্ষতি থেকেই যায়।
যত আগেভাগে আপনি ধূমপান ত্যাগ করবেন আপনার ফুসফুসের ক্ষতি মেরামত করার বেশি সম্ভাবনা থাকে। একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে যে ধূমপান ছাড়ার পরে তা একটুও গ্রহন না করে যদি ২০ বছর কাটিয়ে দিতে পারেন তাহলে সিওপিডি হওয়ার ঝুঁকিটি সেই প্রাথমিক স্তরে চলে যায় যখন আপনি ধূমপান শুরুই করেন নি এবং 30 বছর কাটাতে পারলে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকিও ননস্মোকিং লেভেলে চলে যায়। যত তাড়াতাড়ি আপনি ধূমপান ত্যাগ করবেন ততই ফুসফুসগুলি নিজেদের নিরাময় করতে সক্ষম হবে।তবে আপনি যদি দীর্ঘকাল ধূমপান করেন তবে ক্ষতি স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
রাস্তা একটাই : আপনার ফুসফুসকে রক্ষা করুন।
আপনি সিগারেটের ধূম্রপান থেকে ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি নির্মূল করতে পারবেন না,তবে আপনার ফুসফুসকে 'ডি-টক্স' বা নির্বিষ করতে একে আরো ক্ষয়ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে আপনাকে।
আপনার ফুসফুসকে যথাসম্ভব পরিষ্কার রাখার জন্য এখানে কিছু প্রমাণিত উপায় বাতলে দেওয়া হচ্ছে :
সেকেন্ডহ্যান্ড ধোঁয়া এড়িয়ে চলুন :
অ্যাডেলম্যান বলেছেন যে ধূমপান ত্যাগ করা আপনার ফুসফুসের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস, তবে অন্য মানুষের ধোঁয়ায় শ্বাস না নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সিগারেটের শেষ থেকে আগত ধোঁয়া ও ধূমপায়ীটির মুখ থেকে যে ধোঁয়া বের হয় তাতে শত শত বিষাক্ত রাসায়নিক রয়েছে। এগুলিতে শ্বাস নেওয়ার কারনে ফুসফুসের ক্যান্সার থেকে শুরু করে স্ট্রোক পর্যন্ত হতে পারে।
E-Cigeratte থেকে বিরত থাকুন :
চিকিত্সকরা এখনও ই-সিগারেটের দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি সম্পর্কে গবেষনা করছেন, ইতিমধ্যে কিছু স্বল্পমেয়াদী গবেষণা এর ক্ষতিকারক প্রভাব খুজে পেয়েছে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ই-সিগারেটের ব্যাবহারে আপনার ফুসফুসে শ্লেষ্মা জমে থাকে, যা সংক্রমণের কারণ হতে পারে।
উষ্ণ বাষ্প থেরাপির উপর নির্ভর করা পরিত্যাগ করুন :
যদিও একটি খুব ছোট সমীক্ষায় দেখা গেছে যে উষ্ণ বাষ্প গ্রহনের ফলে সিওপিডি আক্রান্ত লোকদের উদ্বেগ কমে যায়, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ফুসফুসের কার্য্যক্ষেত্রে কোনো উন্নতি হয় কিনা তা প্রমানিত নয়। উদ্বেগ কমানোর বিষয়টিও এই ক্ষুদ্র স্টাডিতে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব। মিউকাস পরিষ্কার করতে উষ্ণ বাষ্প সাহায্য করলেও ফুসফুসকে ঠিকমতো কাজ করতে তা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই কোনো ঝুকি না নিয়ে আপনি উষ্ণ বাষ্প শ্বাসগ্রহনের মাধ্যমে নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
সংক্রমণ রোধ করুন:
ফ্লু এবং নিউমোনিয়ায় ভ্যাকসিন গ্রহণ করুন, ঘন ঘন আপনার হাত পরিষ্কার করুন এবং যাদের নাকের রোগ আর শ্বাসপ্রশ্বাসের সংক্রামক রোগ আছে তাদের সংসর্গ এড়িয়ে চলুন।
বাড়ির অভ্যন্তরে এবং বাইরে দূষণের বিষয়ে সজাগ থাকুন:
আমাদের দেশে মানুষ এখনো সচেতন নয়। দূষণ বড় বড় মেট্রো সিটিতে বেশী হলেও বীনা প্রটেকশনে মানুষ বাইরে বেরোচ্ছে অহরহ। বর্তমান সময়ে করোনা মহামারীর কারনে কিছু মানুষের Masks ব্যাবহারের সচেতনতা বেড়েছে ঠিক। সেই তুলনায় আমেরিকার মতো রাষ্ট্রে মানুষ অনেক সচেতন সে বিষয়ে। সম্প্রতি আমেরিকান ফুসফুস অ্যাসোসিয়েশন প্রস্তাব দিয়েছে, সম্ভব হলে সকলেই যেন নিজের বাড়ীর অন্দরে রেডন (Radon) গ্যাসের উপস্থিতির পরীক্ষা করিয়ে নেয়। কারন,এটি একটি মারাত্মক বিষাক্ত গ্যাস যা ফুসফুসের ক্যানসারের কারন হয়।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ একটি খাবার খান (এবং পান করুন) :
প্রচুর ব্লুবেরি বা Kale স্যালাড খাওয়ার ফলে অনেক বছরের ধূমপান থেকে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা পূর্বাবস্থায় ফিরবে না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে যে বেশি ফল এবং শাকসবজি খাওয়া, বিশেষত সবুজ শাকসব্জি, জামজাতীয় ফল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ অন্যান্য আইটেমগুলি ধূমপান এবং বায়ু দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত আপনার ফুসফুসকে কিছুটা হলেও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।কোরিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে গ্রিন টি (Green Tea) এর মধ্যে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এবং প্রদাহরোধী (Anti-inflammatory) গুণ রয়েছে যা আপনাকে সিওপিডি থেকে দূরে রাখতে পারে , তবে ফলাফলটি চূড়ান্ত নয়।
অনুশীলনের মাধ্যমে আপনার ফুসফুসকে শক্তিশালী রাখুন:
কিছু প্রমাণ রয়েছে যে কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়াম বা এমন যে কোনও কিছু যা আপনার হার্টকে দ্রুত গতিময় করে তোলে, তা আপনার ফুসফুসকে আরও ভালভাবে কাজ করতে সহায়তা করতে পারে । এটি হৃৎপিণ্ড এবং পেশীগুলিকে আরও দক্ষ করে তোলে।

Post a Comment